তিন সিটিতে একই আলামত

নিউজ ডেস্কঃ  রাত পোহালেই দেশের গুরুত্বপূর্ণ তিন সিটি করপোরেশনে ভোট। গতরাতেই শেষ হয়েছে সব ধরনের প্রচারণা। জাতীয় নির্বাচনের আগে এই তিন সিটির ভোটে চোখ পুরো দেশের। এই ভোট নির্বাচন কমিশনের সামনেও এক কঠিন পরীক্ষা। রাজশাহী, সিলেট ও বরিশালের ভোটের তফসিল ঘোষণার পর থেকেই রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে নানা আলোচনা। হিসাব-নিকাশ।

শেষ মুহূর্তে কেমন হবে নির্বাচন। ভোটাররা নির্ভয়ে ভোট দিতে পারবেন না আগের নির্বাচনগুলোর মতো দখল, জালিয়াতির দৃশ্য দেখে ঘরে ফিরবেন- এমন প্রশ্ন ঘুরে-ফিরে আসছে বারবার।

নানা শঙ্কা, ভয় প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মাঝে। যদিও নির্ভার থেকেই নির্বাচনী প্রচার প্রচারণা শেষ করেছেন আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা। শুরু থেকেই ভোটারদের আশ্বস্ত করে অভয় বাণী শুনিয়েছে নির্বাচন কমিশন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে ভোটের মাঠে প্রার্থী-ভোটারদের ভয় শঙ্কা দূর করতে পারেনি কমিশন। বরং তা আরও বেড়েছে। তিন সিটিতে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের অভিযোগ বেড়েছে ক্রমে। অভিযোগের স্তূপ জমলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার উদাহরণ অনেক কম। এমন অবস্থায় সর্বশেষ তিন সিটিতেই বিএনপির প্রার্থীদের কর্মী-সমর্থকদের ব্যাপক ধরপাকড়ের অভিযোগ উঠেছে। নির্বাচন কমিশন ও আদালতের নির্দেশ থাকার পরও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্মী-সমর্থক এমনকি পোলিং এজেন্টদের বাড়ি বাড়ি হানা দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন তিন সিটির বিএনপি মনোনীত প্রার্থীরা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অবশ্য এই অভিযোগের কৌশলী জবাব দিচ্ছে। তারা বলছে, নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ হিসেবে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।

এর আগে গাজীপুর ও খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বড় প্রশ্নের মুখে পড়েছিল নির্বাচন কমিশন। এ দুই সিটির নির্বাচনে ‘শান্তিপূর্ণ কারচুপি’ হয়েছিল বলে বিভিন্ন সংস্থার পর্যবেক্ষণে উঠে আসে। কেন্দ্র দখল, জালভোট ও ভোটারদের কেন্দ্রে যেতে বাধা দেয়া এবং এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়ার ঘটনা ঘটে এই দুই সিটির নির্বাচনে। আর এসব অনিয়মে সহযোগিতার অভিযোগ উঠে খোদ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে। এ অভিযোগের সত্যতা মিলে নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ তদন্তেও। গাজীপুরের নির্বাচনের পর নানা প্রশ্নের মধ্যেই নির্বাচন কমিশন ঘোষণা দিয়েছিল অতীতের ঘটনাগুলোর পুনরাবৃত্তি তিন সিটির নির্বাচনে আর হবে না। সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।
আদতে নির্বাচন কমিশনের অধীনে থাকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ইসির আদেশ মানছে কি না- এ প্রশ্ন তুলছেন তিন সিটির ভোটার এবং প্রার্থীরা। বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে নানা গুজব আর গুঞ্জন। এতে বাড়ছে সাধারণ ভোটাদের ভয় আর আতঙ্ক। এমন অবস্থায় তিন সিটিতে সুষ্ঠু ভোট করে ইসি নতুন নজির গড়বে নাকি খুলনা গাজীপুরের ভোটের মতো নয়া কিছিমের কোন ভোটের মহড়া প্রত্যক্ষ করবে- এটাই এখন দেখার বিষয়।

যেকোনো নির্বাচনে সম্প্রীতির নজির স্থাপন করে আসছিল সিলেট। এ শহরে অতীতে কোনো নির্বাচনে সংঘাত সহিংসতার ঘটনা ঘটেনি। প্রার্থীদের মধ্যে কাদা ছোড়াছুড়িও হয়নি খুব একটা। কিন্তু এবারের নির্বাচন যেন আগের নজির ভাঙার এক বড় আয়োজন। শুরু থেকে প্রধান দুই প্রার্থীর পাল্টাপাল্টি অভিযোগ আসছিল। নির্বাচনের আগ মুহূর্তে যোগ হয়েছে মামলা ও গ্রেপ্তারের আতঙ্ক। বিএনপির প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরীর পক্ষ থেকে নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার ও হয়রানির অভিযোগ তোলা হয়েছে। পোলিং এজেন্টকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হয়রানি করছে বলে অভিযোগ তার। অভিযোগ পাল্টা অভিযোগের মধ্যেই সোমবার তিন লাখ ২১ হাজার ভোটারের এ সিটিতে ভোট গ্রহণ হবে। নগরীতে ১৩৪টি ভোটকেন্দ্রের ৮০টিকেই ঝুঁকিপূর্ণ (নির্বাচন কমিশনের ভাষায় অতি গুরুত্বপূর্ণ) বলে চিহ্নিত করেছে নির্বাচন কমিশন। গতকাল থেকে নির্বাচনী এলাকায় টহলে নেমেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ। শান্তিপূর্ণ ভোটের প্রত্যাশার কথা জানিয়েছেন প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা- এমন চাওয়া এ সিটির ভোটারদেরও।

রাজশাহী সিটির ১৩৮টি কেন্দ্রের ১১৪টিকে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে ধরছে ইসি। এসব কেন্দ্রে সাধারণ কেন্দ্রের চেয়ে বাড়তি নিরাপত্তা থাকবে। প্রার্থীরা বলছেন, এসব কেন্দ্র আসলে ঝুঁকিপূর্ণ। গতকাল নগরীর পরিবেশ নিরুত্তাপ থাকলে আগের কয়েক দিন এ সিটিতে পাল্টাপাল্টি অভিযোগে উত্তাপ ছড়িয়েছে। ভোটের দিন নানা আশঙ্কা করছেন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা। যদিও আওয়ামী লীগের প্রার্থী খায়রুজ্জামান লিটন শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের প্রত্যাশা করে জানিয়েছেন, বিএনপির প্রার্থী মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলের অভিযোগ আসলে নির্বাচনী কৌশল। গত কয়েক দিনে এ সিটিতে বিএনপির মেয়র প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে। গ্রেপ্তার ও ধরপাকড়ে আতঙ্ক ছড়িয়েছে সাধারণ ভোটারদের মাঝে। মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল গতকাল শঙ্কা প্রকাশ করেছেন নির্বাচনে ব্যালট পেপার ষড়যন্ত্র হতে পারে।

বরিশালের ভোটের মাঠ শুরুতে শান্তিপূর্ণ থাকলেও গোড়াতেই উত্তাপ বাড়ে। বিএনপি প্রার্থীর পক্ষ থেকে নেতাকর্মীদের হয়রানি ও গ্রেপ্তারের অভিযোগ উঠে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে। বিএনপির প্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ার নেতাকর্মীদের হয়রানি, গ্রেপ্তার ও প্রচারণায় বাধার অভিযোগ করে আসছেন শুরু থেকে। তবে আওয়ামী লীগের প্রার্থী সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ বরাবরই নির্বাচনের পরিবেশ শান্তিপূর্ণ দাবি করে আসছেন। দুই লাখ ৪৪ হাজার ভোটারের এ সিটিতে ভোটকেন্দ্র রয়েছে ১২৩টি। এর মধ্যে ১১২টি কেন্দ্রকেই গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে নির্বাচন কমিশন। এসব কেন্দ্রে থাকবে বাড়তি নিরাপত্তা। প্রচারণা শেষে এ সিটিতে পরিবেশ আপাতত শান্তিপূর্ণ। তবে কয়েক দিনের গ্রেপ্তার ও ধরপাকড়ের ঘটনায় ভোটের দিনের পরিবেশ নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন ভোটাররা। সূত্রঃ দৈনিক মানবজমিন